ডাইনোসরের উত্থান: এক ফুসফুসীয় গাঁথা
🦖🦖🦖🦖🦖🦖🦖🦖🦖🦖🦖
জুরাসিক পার্ক দেখেনি এমন হয়তো কেউ নেই আমাদের বন্ধুবর্গের মধ্যে! জ্বলজ্যান্ত ডাইনোসর গুলো কেমন হালুমু হুলুম করে ছুটেপুটে বেড়াচ্ছে, এ দৃশ্য দেখতে কার না ভালো লাগে! হ্যাঁ অবশ্যই ওদের লাফালাফি টা স্ক্রীনের ভেতরে যতক্ষণ আবদ্ধ আছে নির্ভয়ে পপকর্ন নিয়ে বসাই যায় ওদের সামনে। সে তো না হয় হলো সিনেমা কিন্তু কখনো কি ভেবেছো How did the Dinos arrive at the first place?? চলো তালে আজকের আড্ডা শুরু করা যাক!
২৫০ লক্ষ বছর আগে পোল্যান্ড ও ফ্রান্সের সমুদ্র উপকূল এবং হ্রদের কিনারা দিয়ে দৌড়ে ছুটে বেড়াতো প্রোরোটোড্যাক্টাইলাস নামে পোষ্য বিড়াল সাইজের এক চতুষ্পদী। আপন খেয়ালে মত্ত এই ছোটোখাটো প্রাণীগুলো হয়তো কখোনোই ভাবেনি যে এদেরই অতিকায় বংশধরেরা একসময় সারা বিশ্ব জুড়ে তাদের আধিপত্য বিস্তার করবে।
🦖🦖🦖🦖🦖🦖🦖🦖🦖🦖🦖
প্রোরোটোড্যাক্টাইলাস এর আবির্ভাব কিন্তু খুব একটা সুখকর সময়ে হয়নি। আমাদের নীল গ্রহটি সবে সবে জীবজগতের এক ব্যাপক বিলুপ্তির (The Great Permian-Triassic Extinction event) দৈন্যদশা কাটিয়ে উঠেছিল… বিশ্বব্যাপী ভয়ঙ্কর উষ্ণায়ন এবং সমগ্র সাইবেরিয়া জুড়ে অকল্পনীয় মাত্রায় অগ্ন্যুৎপাত পঁচানব্বই শতাংশের ওপর জীবকুল কে চিরকালের মতো নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিলো! পার্মিয়ান যুগের শেষসীমায় এই ধ্বংসলীলা যেমন দুঃখদায়ক তেমনি টিকে থাকা পাঁচ শতাংশ জীবের কাছে পরবর্তী ট্রায়াসিক যুগ (২৫০ লক্ষ থেকে ২০০ লক্ষ বছর) ছিল এক সুবর্ণ সুযোগ সবকিছু নতুন করে শুরু করার এবং “জীবন”-এর পথ নতুনভাবে প্রশস্ত করার। এমন সুযোগ কিন্তু হাতছাড়া করেনি প্রোরোটোড্যাক্টাইলাস এবং সমগোত্রীয় ডাইনোসরেরে পূর্বপুরুষেরা যাদের একত্রে বলা হতো ডাইনোসরোমর্ফস। আগামী ২০ লক্ষ বছরের মধ্যেই এই ডাইনোসরোমর্ফস বিবর্তিত হয়ে জন্ম দিলো একাধিক মূখ্য ডাইনোসর (Dinosauria) বংশ যাদের মধ্যে ছিল মাংসাশী থেরোপড বংশ, অতিকায় লম্বা গলার গাছপাতা ভক্ষণকারী সরোপোড বংশ এবং আজকের পাখিদের পূর্বপুরুষ অর্নিথিস্কিয়ান বংশ। ট্রায়াসিক যুগে আবির্ভাবের পর এদের সাইজ কিন্তু আজকের ঘোড়া বা গাধার থেকে মোটেও বেশি ছিল না তবে ট্রায়াসিকের মাঝামাঝি থেকেই এরা আরও বড়ো আকার ধারন করতে থাকে। সময়ের ধারা বেয়ে আরো অনেক সামনে এগিয়ে এলে দেখা যায় এই তিনটি বংশের নাম উজ্জ্বল করেছিলো যথাক্রমে টায়রানোসরাস রেক্স, ব্রাকিওসরাস, ট্রাইসেরাটপ্স প্রমুখ জুরাসিক পার্ক খ্যাত ডাইনোসরেরা। শুধু কল্পবিজ্ঞানের জুরাসিক পার্কই নয়, বরং সমগ্র জুরাসিক যুগ (২০০ লক্ষ থেকে ১৪৫ লক্ষ বছর) টা জুড়েই দাপিয়ে বেড়াতো এই ডাইনোসরের দলবল কিন্তু প্রশ্ন হল কি এমন কারণ যার জন্য এরা সমসাময়িক অন্যান্য অনেক প্রাণীকেই বিবর্তনের দৌড়ে পিছিয়ে ফেলে হয়ে উঠেছিল সর্বেসর্বা?
🦖🦖🦖🦖🦖🦖🦖🦖🦖🦖
ট্রায়াসিক যুগে ডাইনোসরের পাশাপাশি আরও একটি প্রাণীকুল, যাদের খাদ্যাভ্যাস ছিল ডাইনোদের মতই প্রচুর সংখ্যায় বংশবিস্তৃতিতে সফল হয়ে উঠেছিল, এরা হল সিউডোসুচিয়ান্স, আজকের কুমির এবং ঘড়িয়ালদের পূর্বপুরুষেরা। বর্তমানে এদের মাত্র ২৫টি প্রজাতি বেঁচে থাকলেও সেই সময়ে এদের বৈচিত্র্য এবং প্রাচুর্য ডাইনোসরদের চেয়ে যথেষ্ট বেশি ছিল। আগে মনে করা হতো সুগঠিত মাংসপেশী, তীক্ষ্ণ নখ ও দাঁত এবং দ্রুতগতিতে দৌড়ানোর ক্ষমতা ডাইনোসরদের পরবর্তীতে কম্পিটিশনে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছিলো কিন্তু তাই যদি হয়, জুরাসিকের অনেক আগেই এই কম্পিটিশন ডাইনোদের জেতা উচিৎ ছিল কিন্তু এত বেশি সময় কেনো লাগলো? জুরাসিকে কি এমন ম্যাজিকাল ঘটল যা ট্রায়াসিকে ছিল না? এর উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের একটা ডাইনোসর ধরে অ্যানাস্থেশিয়া দিয়ে অপারেশন করে দেখতে হয়! না না অতো কিছুর দরকার নেই!!!
🦖🦖🦖🦖🦖🦖🦖🦖🦖🦖🦖
ট্রায়াসিকের শেষে, আজ থেকে প্রায় ২০০ লক্ষ বছর আগে এক আমূল ভৌগোলিক পরিবর্তন ঘটে। এর আগে পৃথিবীর তিন ভাগ জল যেমন একত্রে ছিল এক ভাগ স্থলও একত্রেই এক মহা ভূখণ্ড রুপে বিরাজমান ছিল যাকে ভূবিজ্ঞানীরা সচরাচর প্যান্জিয়া বলে থাকেন। কিন্তু ট্রায়াসিকের শেষে এবং জুরাসিকের শুরুতে প্যান্জিয়াতে ধরে এক বিরাট ফাটল এবং সেই ফাটল চতুর্দিকে বিস্তৃত হয়ে উত্তর আমেরিকা কে আলাদা করে দেয় ইউরেশিয়া থেকে আর দক্ষিন আমেরিকা ছেড়ে ছলে যায় আফ্রিকাকে। আরও একবার আমাদের ক্ষতবিক্ষত নীল গ্রহ থেকে রক্তবন্যার মতো লাভা ক্ষরণ হতে থাকে, ছাই এর গুঁড়োয় ঢেকে যায় সূর্য, বাতাসে ক্রমাগত বাড়তে থাকে কার্বন- এবং সালফার ডাই অক্সাইডের মতো গ্যাস, কমে যায় অক্সিজেনের পরিমাণ, হিমযুগের সাথে আগ্নেয় দাবদাহ সব মিলে এক অসহনীয় পরিস্থিতি তৈরি হয়। আরও একবার মুছে যায় তিরিশ শতাংশ জীবকুল যার মধ্যে অধিকাংশই ছিল বড়ো মাপের প্রাণীরা কারণ যত বড়ো শরীর তত বেশি অক্সিজেনের চাহিদা এবং তা পূরণের কোনো সুযোগ এই সময় ছিল না! ঠিক এই কারনেই সিউডোসুচিয়ান্স একে একে অবলুপ্তির পথে এগিয়ে যায়, মারা পড়ে অনেক প্রজাতির ডাইনোসরও কিন্তু তবুও তাদের অনেকেই এ যাত্রায় বেঁচে যায় এবং জুরাসিকের বাকি পর্ব জুড়ে আধিপত্য বিস্তার করে। যে বিভীষিকাময় পরিস্থিতি সমসাময়িক এবং প্রায় সমান মাপের সিউডোসুচিয়ান্সদের বিলোপ ঘটালো তার হাত থেকে ডাইনোদের রক্ষা পাওয়ার সিক্রেট টা কি?
ডাইনোসরদের জীবাশ্ম ঘেঁটে উঠে আসা তথ্য বলছে এই অতিকায় প্রাণীদের সিক্রেট ছিল এদের হাইপার এফিসিয়েন্ট লাংস বা ফুসফুস যার নকশা ছিল আজকের দিনের পাখির ফুসফুসের মতো। খুব সহজ কথায় বলতে গেলে পাখির ফুসফুস এবং সংশ্লিষ্ট বায়ুথলির কার্যপ্রণালী অনেকটা পাতলা পর্দা বিশিষ্ট স্পঞ্জের মতো যা বাতাসের একমুখী প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে এবং প্রতিবার নাক থেকে ভেতরে গ্রহন করা বাতাস থেকে সর্বাধিক পরিমান অক্সিজেন শুষে নিতে পারে। ঠিক এই কারণেই পাখির ফুসফুস সমস্ত ভার্টিব্রেটদের মধ্যে সব থেকে বেশি কার্যকরী ডিজাইন। পাখির বায়ুথলির সংকোচন প্রসারণ প্রায়ই মেরুদণ্ডের হাড়ে ছোটো ছোটো খাঁজের সৃষ্টি করে এবং ঠিক একইরকম চিহ্ন পাওয়া গেছে বিভিন্ন ডাইনোসর জিবাশ্মের মেরুদণ্ডের প্রায় একই জায়গায় যা থেকে বৈজ্ঞানিকেরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে বিশাল আকারের হাইপার এফিসিয়েন্ট লাংস ছিল ডাইনোদের আভ্যন্তরীণ শারীরিক গঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ এবং মৌলিক বৈশিষ্ট্য যা নখ, দাঁত, মাংসপেশি এবং দ্রুত ছোটার সামর্থ্যের পাশাপাশি সমসাময়িক কম্পিটিশনে এগিয়ে রেখেছিলো এবং পরবর্তীতে একক রাজত্ব স্থাপনের পথ প্রশস্ত করেছিলো।
রাজত্ব স্থাপন তো হলো, কিন্তু ডাইনোদের এই গৌরবময় যুগের অবসান কিভাবে হল? সে গল্পও হবে পরের আড্ডাতে… জানতে হলে আরুষের সঙ্গে থেকো।
References:
- The World of Dinosaurs by Mark Norell, University of Chicago Press, 2019.
- The unlikely rise of the dinosaurs by Steve Brusatte, New Scientist, 1st August, 2020l

